ইসলামের প্রেক্ষিতে গণতন্ত্র

আজকাল ব্লগিয় সূযোগ সুবিধায় মানুষ জন অনেক অনেক বিষয়ে আলোচনা করে থাকেন। এর মধ্যে গণতন্ত্র ও ইসলাম বিষয়ক আলোচনা হয়। তবে বেশীর ভাগ আলোচকের আলোচনা থেকে বুঝা যায় ঐ সব আলোচকের বর্তমান যুগ সম্পর্কে কোন বিজ্ঞান ভিত্তিক ধারণা লালন করেন না। বরং এক ধরণের অস্বাভাবিক মানসিকতায় আচছন্নে ডুবে আছেন।
এ ধরণের একটি তাত্ত্বিক বিষয়ে সঠিক ধারণা পেতে হলে প্রয়োজন এ সম্পর্কে জানাশোনা এবং পড়াশুনার জন্য চেষ্টা করা। সে উদ্দেশ্যেই পাঠকদের জন্য এ লেখটি দেয়া হল। লিখেছেন শাহ আব্দুল হান্নান, চিন্তাবিদ ও সাবেক সচিব। যারা গভীরভাবে বিষয়টি বুঝতে চান লেখাটি তাদের কাজে লাগবে আশা করি।

ইসলামের প্রেক্ষিতে গণতন্ত্র
শাহ আব্দুল হান্নান

বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্র একটি পরিচিত শব্দ। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে রাজনৈতিক আন্দোলনের লক্ষ্য সংশ্লিষ্ট দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। গণতন্ত্র আধুনিক বিশ্বে একটি স্বীকৃত ও সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। অন্যদিকে দেখঅ যায় গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিভিন্ন মতামত। বিভিন্ন ইসলামী দলে এজেন্ডায় রয়েছে গণতন্ত্রের কথা, অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা। আবার এমন সব দল বা ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা যায়, যারা গণতন্ত্রকে ইসলামসম্মত মনে করেন না, কেননা গণতন্ত্রে জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে আমাদের সূক্ষ্ম এ গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। শব্দগত মারপ্যাচের উর্ধ্বে গিয়ে বিষয়টি ভালভাবে বোঝা দরকার। আমরা দেখছি আধুনিক বিশ্বে ইসলামী দলসমূহ ও ব্যক্তিবর্গ, ইসলামী পন্ডিতগণ এমন রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা চিন্তা করেন যেখানে সরকার পার্লামেন্টের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করবে। সকলের মত প্রকাশের অধিকার তথা ভোটাধিকার থাকবে, আইনের শাসন থাকবে, বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা থাকবে, সংবাদপত্রের স্বাধনিতা থাকবে, মৌলিক মানবাধিকার রক্ষিত হবে ইত্যাদি। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা বলা হয় তখন তার পূর্বশর্ত হিসেবে এসবের কথাই বলা হয়। অর্থাৎ গভীর বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ইসলামী দলগুলোর সরকার ও রাষ্ট্র সংক্রান্ত ধারণা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গঠন কাঠামো একই ধরণের।

তত্ত্বগতভাবে বলা যায় যে, কেবল সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে যখন ইসলামে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মুখ্য সেখানে পাশ্চাত্য গণতন্ত্রে জনগণের সার্বভৌমৈত্বের কথা বলা হয়েছে। যদিও এখানে উল্লেখ না করে পারা যায় না যে, সার্বভৌমত্বের ধারণা পাশ্চাত্যে এক রকম নয়। কোন কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এ রকম কথা বলেছেন যে, সার্বভৌমত্বের ধারণার কোন প্রয়োজন নেই। গণতন্ত্র সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রন্থে সার্বভৌমত্বের ধারণাকে তেমন গুরুত্বের সাথে আলোচনাও করা হয় না। তবে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে সার্বভৌমত্ব শব্দটির আপত্তি সম্পর্কে এ সময়ের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা ইউসুফ আল কারযাভী প্রণীত ‘Priorities of The Islamic Movement in the coming Phase’ গ্রন্থের ‘The Movement and the political Freedom and Democracy’ শীর্ষক আলোচনার কিছু অংশ এখানে উদ্বৃত করা প্রয়োজন মনে করছিঃ

The fear of some people here is that democracy makes the people a source of power and even legislation (although legislation is Allah’s alone) should not be heeded here, because we are supposed to be speaking of a people that is Muslim in its majority and has accepted Allah as its Lord, Mohammad as its Prophet and Islam as its Religion. Such a people would not be a expected to pass a legislation that is contestable in Islam and its incontestable principles and conclusive rules. Any way these fears can be over come by one article (in the constitution) that any legislation contradicting the incontestable provisions of Islam be null and void.

কিছু সংখ্যক মানুষের ভয় গণতন্ত্র মানুষকে ক্ষমতার উৎসে পরিণত করে এবং আইন প্রণয়ন করার অধিকার দেয় (যদিও আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর), তার প্রতি কর্ণপাত করা উচিত হবে না। কারণ আমরা এমন এক মানবগোষ্ঠী সম্পর্কে কথা বলছি যারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে, মুহাম্মদ (সা) -কে তাদের নবী এবং ইসলামকে তাদের ধর্ম হিসেবে মেনে নিয়েছে। আশা করা যায়, এ ধরনের মানুষ এমন আইন প্রণয়ন করবে না, যা ইসলামের অকাট্য নীতি ও সিদ্ধান্তমূলক আইনের পরিপন্থী হবে। যা হোক ইসলামের অলংঘনীয় বিধানের পরিপন্থী যে কোন আইন বাতিল বলে গণ্য করা হবে এমন একটি অনুচ্ছেদ সংবিধানের সংযোজন সংযোজন করে এ আশংকা দূর করা যেতে পারে।
এছাড়া রাজনৈতিক কর্মকান্ডে মানুষ তথা উম্মতের দায়িত্ব সম্পর্কে মহাকবি ড. আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল- এর মতামত হচেছ এরকমঃ

‘ইসলাম গোড়াতেই স্বীকার করে নিয়েছে যে, বাস্তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারক ও বাহক হল উম্মত এবং যেসব কার্যক্রম নির্বাচকমন্ডলী তাদের নেতা নির্বাচনের নিমিত্ত গ্রহণ করে তার অর্থ শুধূ এই যে, তারা তাদের সম্মিলিত ও স্বাধীন নির্বাচন পদ্ধতি দ্বারা উক্ত রাজনৈতিক ক্ষমতাকে এমন একজন নির্দিষ্ট ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের মাঝে ন্যস্ত করে দেয়, যারা তাকে উক্ত ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করে। ইসলামী আইন প্রণয়নের ভিত্তি মিল্লাতের সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতি ও যৌথ মতের উপর প্রতিষ্ঠিত।’ [ইসলামের রাজনৈতিক চিন্তাধারা, লাহোর ১৯১০-১৯১১, ‘মহাকবি ইকবাল’, ড. আবু সাঈদ নূরুদ্দীন, পৃ -২৩৪]

আমরা দেখছি যে, অনেক ইসলামী পন্ডিত গণতন্ত্র শব্দকে শর্তসাপেক্ষে ইসলামের মধ্যে আত্মস্থ করে নিয়েছেন। ড. আবু সাঈদ নূরুদ্দীন-এর ‘মহাকবি ইকবাল’ গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই যে, আল্লামা ইকবাল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট ছিলেন না। কিন্তু তিনি তার লেখায় উল্লেখ করেন যে, গণতন্ত্রের কোন বিকল্প নেই। তিনি তার Reconstruction of Religious Thought in Islam-এর ৬ষ্ঠ ভাষণে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে আরও বলেন, ‘ইসলামী রাষ্ট্র স্বাধীনতা, সাম্য, এবং স্থিতিশীলতার চিরন্তন বিধানসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতির নীতিমালা শুধু ইসলামের মৌলিক ভাবধারার সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং যেসব শক্তি মুসলিম বিশ্বে কার্যরত রয়েছে তাকেও সুসহংহত করা অপরিহার্য।’ [মহাকবি ইকবাল, ড. আবু সাঈদ নূরুদ্দীন, পৃ-২৩৫]

ইকবালের মতে, গণতন্ত্রের ভিত্তি যদি রূহানী ও নৈতিক হয় তাহলেই তা হবে সর্বোৎকৃষ্ট রাজনৈতিক পদ্ধতি। ইসলামী রাষ্ট্রকে এ কারণেই তিনি “রূহানী গণতন্ত্র” বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইংরেজী সাময়িকী ‘The New Era’ – এর ২৮ জুলাই ১৯১৭ সংখ্যায় তিনি বলেন, ‘ইসলামে গণতন্ত্র অধিকাংশ ইউরোপীয় সমাজসমূহের মতো অর্থনৈতিক সুযোগের সম্প্রসারণ থেকে উৎপন্ন হয়না; বরং এটি একটি রূহানী নীতি, যা ঐ কথার ভিত্তিতে এসেছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তিই কতকগুলো সুপ্ত শক্তির এমন একটি আধার, যার সম্ভানাসমূহকে এক বিশেষ গুণ ও চরিত্রের দ্বারা উন্নত করা যেতে পারে। ’ [প্রাগুক্ত, পৃ-২৩৯]

অর্থাৎ ইসলাম এমন এক গণতন্ত্র দিয়েছে যা আল্লাহর আইনের অধীন।

অন্যদিকে আমরা দেখি মাওলানা মওদূদী পঞ্চাশ বছর পূর্বে তার “ইসলামের রাজনৈতিক মতবাদ” গ্রন্থে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য Theo-democracy শব্দ দু’টি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ তিনি Democracy বা গণতন্ত্র শব্দটি পরিত্যাগ করেননি বরং আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অধীনে এটি গ্রহণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তার জীবনের শেষ অধ্যায়ের একটি ব্ক্তব্য নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

করাচির ‘আখবারে জাহান’ পত্রিকায় ১৯৬৯ সালের ২রা এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইসলাম ও গণতন্ত্র পরস্পর বিরোধী নয়। গণতন্ত্র সেই শাসন ব্যবস্থার নাম, যেখানে জনমতের ভিত্তিতে সরকার গঠিত, পরিচালিত ও পরিবর্তিত হয়। ইসলামী শাসন ব্যবস্থাও তদ্রুপ। তবে পাশ্চাত্য গণতন্ত্র থেকে আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ভিন্ন। কেননা পাশ্চাত্য গণতন্ত্র লাগামহীন হয়ে থাকে। জনগণের রায় হলালকে হারাম করে দিতে পারে, যেমন বৃটেনে হয়েছে এবং হচেছ। পক্ষান্তরে ইসলামী গণতন্ত্র কুরআন ও হাদিস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। গোটা জাতি চাইলেও ইসলামের সীমানার ব্ইরে গিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সমাজতন্ত্র এর ঠিক বিপরীত। সমাজতন্ত্র এক জীবন দর্শনের নাম। তার রয়েছে নিজস্ব আকীদা, বিশ্বাস, দর্শন ও নৈতিকতা। ইসলামের সাথে তার কোনোই মিল নেই। [মাওলানা মওদূদীর সাক্ষাৎকার, আধুনিক প্রকাশনী প্রকাশিত, ১ম সংস্করণ, পৃ-২৬৩]

লন্ডনের মাজাল্লাতুন গুরাবা পত্রিকায় ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারী সংখ্যায় প্রকাশিত এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, যুগের মানুষদের কথা বুঝানোর জন্য আধুনিক পরিভাষা ব্যবহার কার অপরিহার্য। তবে এগুলো ব্যবহারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কোনো কোনো পরিভাষা বর্জন করা ভালো এবং ওয়াজিব, যেমন সমাজতন্ত্র। আর কোনো কোনোটার ব্যবহার এ শর্তে জায়েজ যে, তার ইসলামী তাৎপর্য ও পাশ্চাত্য তাৎপর্যের পার্থক্য পুরোপুরিভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। যেমন- গণতন্ত্র, সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও সংসদীয় পদ্ধতি। [মাওলানা মওদূদীর সাক্ষাৎকার, আধুনিক প্রকাশনী প্রকাশিত, ১ম সংস্করণ, পৃ-২৫৫]

আমরা এটাও লক্ষ্য করেছি, পাকিস্তানে যখন বিশ্বের প্রথম ইসলামী সংবিধান রচিত হচ্ছিল তখন তার মধ্যে গণতন্ত্র শব্দটি নেওয়া হয়েছিল আলেমদের সমর্থনে। প্রকৃতপক্ষে একটি আদর্শ প্রস্তাবনা রূপে পাকিস্তানে শাসনতন্ত্রের ভূমিকা আলেমরাই প্রণয়ন করেছিলেন। এ ভূমিকায় গণতন্ত্রের বিষয়টি বলা হয়েছে এভাবেঃ
Wherein the principles of democracy, freedom, equality, tolerance and social justice, as enunciated by Islam, shall be fully observed.

গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সমতা, সহনশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার নীতি ইসলামে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, পুরোপুরি সেভাবে মান্য করতে হবে।

অর্থাৎ ইসলাম গণতন্ত্রকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে তা সেভাবে অনুসৃত হবে। এর অর্থ হচ্ছে আলেমগণ, ইসলামী রাজনীতিকগণ শর্তসাপেক্ষে গণত্ন্ত্র শব্দটি, গনতন্ত্র পরিভাষাটি এবং তা দ্বারা যা বোঝায় তা গ্রহন করেছেন। আমরা আগে দেখতে পাই যে, আল্লামা ইউসুফ আল কারযাভী তার Priorities of The Islamic Movement in the Coming Phase, গ্রন্থের একটি আলোচনার শিরোনাম করেছেন, ‘The Movement and Political Freedom and Democracy.’ এতে তিনি দেখিয়েছেন যে, ইসলাম কোন স্বৈরাচার বা রাজতন্ত্র সমর্থন করে না। তিনি আরও দেখিয়েছেন যে, Political Freedom-এর মধ্যেই ইসলাম বিকশিত হয়। তিনি দেখিয়েছেন যে, যদিও ইসলাম গণতন্ত্র থেকেও ব্যাপক একটি বিষয়, একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, তথাপি তিনি গণতন্ত্রকে ইসলামের সাথে সংগতিপূর্ণ মনে করেন এবং ইসলামে মানুষের জন্য যে সকল মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা গণতন্ত্রের মাধ্যমেই পূরণ করা সম্ভব। তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে লিখেছেন। তবে যারা ভয় পান যে, গণতন্ত্রের নামে ইসলাম বিরোধী আইন প্রণীত হতে পারে, তাদেরক আশ্বস্ত করার জন্য সংবিধানে ‘কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন পাশ করা যাবে না’ এমন একটি ধারা সংযোজনের তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন,

… …
যা হোক, গণতন্ত্র যে সকল নীতি ও নিশ্চয়তা দান করেছে তা শাসকদের উচ্চাশা ও খেয়ালীপনার উপর একটি নিয়ন্ত্রণ আরোপের নিমিত্তে ইসলাম পৃথিবীতে যে সকল রাজনৈতিক নীতির অবতারণা করেছে তার নিকটতম। এ সকল নীতিসমূহ হচেছ শূরা (consultation), নসিহত (পরামর্শ প্রদান), যা সংগত তার আদেশ দেওয়া, যা খারাপ তা বর্জন করা, অবৈধ আদেশসমূহ অমান্য করা, অবিশ্বাস প্রতিরোধ করা এবং যখনই সম্ভব শিক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবিধান করা। স্বাধীন রাজনৈতিক পরিবেশ এবং গণতন্ত্রেই কেবল সংসদীয় পদ্ধতির বৈধতা ও ক্ষমতা স্বীকৃত এবং জনগণের প্রতিনিধিগণ যে কোন সরকারের উপর সংবিধান লংঘনের অপরাধে অনাস্থা জ্ঞাপন করতে পারে এবং এটি (গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্বাধীনত) এমন একটি পরিবেশ যেখানে স্বাধীন সংবাদপত্র, নিরপেক্ষ সংসদ, বিরোধী দলের অবস্থান এবং জনসাধারণের মতামত সর্বাপেক্ষা অধিক প্রতিফলিত।

উপরের আলোচনা থেকে লক্ষ্য করা যায় যে, ইসলামী চিন্তাবিদ ও মুসলিম জনগণ ভোটাধিকার, আইনের শাসন এবং জনগণের নির্বাচিত সরকারই চায়। এসব বোঝাবার জন্যই আজকাল ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সার্বিক প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, ‘গণতন্ত্র’ শব্দ গ্রহণ করার মধ্যে কোন অসুবিধা নেই। পাশ্চাত্যে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বোঝবুঝি রয়েছে যে, ইসলাম আগ্রাসী একনায়কত্ববাদী (violent, authoritarian), এর ফলে এসব দূর হবে। মুসলিম বিশ্বেও এর ফলে রাজ-বাদশাহ ও স্বৈরশাসকগণ অন্যায় সুযোগ গ্রহন করতে পারবেনা। আমরা দেখছি যে, বিভিন্ন শাসনতন্ত্রে ব্যবহার ছাড়াও ইসলামী চিন্তাবিদগণ ইতিমধ্যেই ‘গণতন্ত্র’ পরিভাষাটি গ্রহন করেছেন। এটি সংগত। আমরা আশা করি এ আলোচনা ‘গণতন্ত্র’-এর পরিভাষা সম্পর্কে বিতর্ক দূর করতে সহায়তা করবে।

[লেখাটি ‘গণতন্ত্র ও ইসলাম’ নামে ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিইট অব ইসলামিক থ্যট’ প্রকাশিত (২০০৫) সংকলনের ৯২-৯৬ পৃষ্ঠা থেকে নেয়া হয়েছে].

4 Responses to “ইসলামের প্রেক্ষিতে গণতন্ত্র”

  1. arnab2010 Says:

    আচ্ছা একটা বিষয় বলুন তো, যদি কোন দেশের ধরুন সবচাইতে যোগ্য ব্যক্তিটি ইহুদী হল। তবে কী হবে? কারন দেশটি ইসলামী দেশ হলে, সে ব্যক্তি দেশের সর্ব্বোচ্চ নেতা হতে পারবে না। বা নারী হলেও নয়। বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব চলছে কারন সাংবিধানিক ভাবে দেশের সর্ব্বোচ্চ পদপর্যাদাধর হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি। তাই সেটা ইসলামকে কন্ট্রাডিক্ট করেনি। হ্যা যা বলছিলাম, সেই ইহুদী ব্যক্তি কিন্তু প্রধাণ হতে পারবেন না, কারন সে ইহুদী। তাহলে কিন্তু আবার গণতন্ত্র ব্যহত হচ্ছে। কারন রাষ্ট্রের ক্ষমতা অধিগ্রহণ হতে বিশেষ জনগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। হোক তা minority. তাই আসলে যা পালন করা হবে তা কিন্তু গণতন্ত্র নয়। বলা যায়, গণতন্ত্রের একটা অপভ্রংশ, যার নাম দিলাম ইসলামী গণতন্ত্র। তাই ইসলাম গণতন্ত্রের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ কথাটা ঠিক নয়। একটি ভুল কথাকে বরং উপস্থাপন মাত্র। বরং বলা যায়, হ্যা ইসলামে এমন কিছু provision রয়েছে যার গণতন্ত্রের কিছু কিছু মিল বিদ্যমান।.

  2. Munim Says:

    কমেন্ট করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। তবে আমি দুঃখের সাথে বলছি আপনি কি বুঝাতে চাচ্ছেন তা আমি বুঝতে পারিনাই। অবশ্যই এর জন্যে আমিই দায়ী। গণতন্ত্রের মানে হচ্ছে অধিকাংশ মানুষের পছন্দনীয় দল বা ব্যাক্তির শাসন। তাই ইহুদী ব্যাক্তি যতই যোগ্য ব্যাক্তিত্বের অধিকারী হোন না কেন যদি একটি রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ পছন্দ না করলে উনাকে রাষ্ট্র প্রধাণ বানান যাবেনা।

    বাংলাদেশে যদি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থাকতো তখনও খালেদা হাসিনা নারী হলেও রাষ্ট্রপতি থাকতেন।

    ইসলাম কি গণতন্ত্র বিরোধী? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে কুরআনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যায়। কোরআনে ‘গণতন্ত্র’ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে না বলা হলেও সূরা ‘আশ শূরায়’ পরামর্শের কথা বলা হয়েছে। ‘যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, পারষমরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে’ (কোরআন ৪২ : ৩৮)।
    এই আয়াতের মুখ্য শব্দটি হচ্ছে ‘শূরা’ যা পারষমরিক পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করার জোর তাগিদ দিয়েছে। এখন প্রশ্ন তোলা যায়, কোরআনের এ আয়াতের সঙ্গে ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ গঠনের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কী? নির্বাচন কমিশন সাধারণ জনতার মতামত বা পরামর্শ নিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারে। যেহেতু লাখ লাখ লোকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলা সম্ভব নয়, সেহেতু প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সেই ‘পরামর্শ’ (consultation) গ্রহণ সম্ভব। গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের লক্ষ্যে সংসদ সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পরোক্ষভাবে সব ভোটারের মতামত গ্রহণ করে। সুতরাং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠন হওয়ার আগে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও মত প্রকাশ করা কোরআনের এ বাণীর আক্ষরিক ও চেতনাগত অনুবাদ ছাড়া কিছু নয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অনুবাদক ও কোরআন গবেষক আল্লামা ইউসুফ আলী বলেছেন, মহানবী (সা.) ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এবং ইসলামের প্রথম যুগের শাসকরা ‘পরামর্শের নীতির’ পূর্ণ ও সফল বাস্তবায়ন করেছেন। আধুনিককালের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে (অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও) এই নীতি বাস্তবায়নের একটি চেষ্টা মাত্র। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ইসলাম গণতন্ত্রের বিরোধী তো নয়ই, বরং রাষ্ট্রে সমানাধিকারের ভিত্তিতে বহুত্ববাদী, বহুজাতিক সমাজ বিনির্মাণের পক্ষে।
    .

  3. arnab2010 Says:

    যদি সেই ইহুদী ব্যক্তিটি জনপ্রিয় হয়েও থাকে তবু কিন্তু তিনি হতে পারতেন না। কারন ধর্মে নিষেধ আছে। অপরপক্ষে ধর্মীয় কারনেই তার জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে। একটি প্রভিশনের মাধ্যমে অপর একটি প্রভিশন বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আর মহিলা রাষ্ট্রপতি সম্ভবপর নয়। এ নিয়ে বিতর্ক আগেই হয়েছে। খালেদা যখন প্রথম ক্ষমতায় আসেন তখন এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। এবং আলেমগণ এই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে খালেদা রাষ্ট্রপতি নয়। তাই সমস্যা নেই। ইসলামে রাষ্ট্রের প্রধান মহিলা হবার বিধান নেই। তাই আমি বলছিলাম, যখন গণতন্ত্রের কিছু নীতি লঙ্ঘিত হচ্ছে, তাই এটাকে গণতন্ত্র না বলে ইসলামী গণতন্ত্র বলে অভিহিত করা উচিৎ। কারন মূল গণতন্ত্রের সকলের সমান অধিকার এই মতবাদে এটি বিশ্বাসী হবে না। এর মতোবাদ হচ্ছে সকল মুসলিম পুরুষের সমান অধিকার, তবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিজস্ব অধিকার রয়েছে। যা মুসলমানদের চাইতে পৃথক….

    • Munim Says:

      আপনি যা বলেন বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাস্তব সত্য। তবে আমার লক্ষ্য ভিন্ন কিছুর……….. আপনাকে ধন্যবাদ।.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s


Follow

Get every new post delivered to your Inbox.